Review

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অভিজিৎ সেনের পঞ্চাশটি গল্প

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অভিজিৎ সেনের পঞ্চাশটি গল্প
নীহারীকা সান্যালের কলমে

সম্প্রতি হাতে পেলাম অভিজিৎ সেনের ‘পঞ্চাশটি গল্প’। সাধারণত এধরনের বৃহৎ সংকলনে বৈচিত্র্যের প্রাচুর্য থাকে না, একঘেয়েমির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বইটি সম্পূর্ণ শেষ করে হতচকিত এবং বিমুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অমিয় দেব যথার্থই বলেছেন, কী জাদু আছে অভিজিৎ সেন-এ যে তিনি পরপর পঞ্চাশটি গল্প পড়িয়ে নিতে পারেন!
সংকলনের প্রথম গল্প ‘নদীর মধ্যে শহর’। এখানে কথক বন‍্যাকবলিত একটি অঞ্চলের দুর্দশার কথা শোনাতে গিয়ে মুখোমুখি করান বিনয় নামক এক অদ্ভুত পুরুষের সঙ্গে। জন্মসূত্রে উচ্চবংশজাত বিনয় সমাজকে অস্বীকার করে বিবাহ করে অন্ত‍্যজ শ্রেণীর মহারানী কে। বিনয়কে প্রচলিত মাপদণ্ডে মাপতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে থমকে যায় উত্তম পুরুষে বর্ণিত কথক। আমাদের ভেতরে চোরাস্রোতের মতন ভাসমান আজন্মলালিত ভণ্ডামিকে প্রতি মুহূর্তে আয়নার সামনে অস্বস্তিকর অবস্থায় দাঁড় করান অভিজিৎ সেন। গল্পের শেষে বিনয়ের মৃত্যু, শব দাহ করে মেথরদের ন্যাড়া হয়ে চলে যাওয়াতে তার প্রকৃত স্বজনকে চিনিয়ে দিয়ে গল্প শেষ করেন লেখক।
দ্বিতীয় গল্প ‘মালানীপুরের যাত্রী’ তে লেখক রাজনৈতিক পটভূমিকার বাতাবরণের আড়ালে এঁকেছেন চিরাচরিত সমাজের নিয়মবহির্ভূত এক আপাত সমান্তরাল প্রেমের গল্প। ভালোবাসাই যে বিপ্লবের চালিকাশক্তি সে সত‍্যেই এই কাহিনীর প্রতিটি ছত্র সম্পৃক্ত।
তৃতীয় গল্প ‘লখিন্দর ফিরে আসবে’ যেমন দেখায় আজীবন বিজ্ঞানমনস্কতার আড়ালে সুপ্ত সংস্কার কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে এবং কখনো তা অজান্তেই বেঁচে থাকার মানকে হয়তো মুহূর্তে ত্বরান্বিত করে এক জাদুবাস্তবতায়।
লেখকের মুন্সিয়ানা এখানেই যে প্রতিটি গল্পই আসলে প্যান্ডোরার বাক্স, যার গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করা পাঠকের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।যেমন ‘দেবাংশী’ গল্পটিতে এক আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাকে যেভাবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন অসহায়তা থেকে প্রতিরোধে উত্তরণ ঘটান স্বপ্নপ্রসূ লেখক, তা একটুও অবাস্তব বলে মনে হয় না। যেভাবে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার উন্মোচন ও ন্যারেশানের মধ্যস্থতায় সময়-সমাজের আয়তনটিকে ধরতে পারেন লেখক অসামান্য শিল্পকুশলতার সঙ্গে, তার উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতপক্ষেই খুব বেশি মিলবে না। আর ভেতরে ভেতরে নিজের মতো করে বৈজ্ঞানিক সমাজবীক্ষার নিশ্ছিদ্র অনুশীলন না থাকলে ‘দেবাংশী’, ‘দীঘি’, ‘ঋষির শ্রাদ্ধ’, ‘ব্রাহ্মণ্য’—এই জাতীয় গল্পের পরিকল্পনা করাও সত্যিই অসম্ভব।
আবার ‘ধানপোকা’ গল্পে বাবা এবং মেয়ের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অসহায়তা মনকে সিক্ত করে। অন্তত পনেরোটি এরকম গল্প এ সংকলনে আছে, যা রাতের ঘুম কেড়ে পাঠককে ভাবাবে। ‘স্ফিংকস’, ‘সীমান্ত’, ‘একজন প্রতারক’, ‘জেহাঙ্গী’, ‘হিমঘর’, ‘দীঘি’, ‘কলাপাতা’—কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি!
প্রতিটি গল্পই বিষয়ের অনন্যতাই স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনকে অন্যভাবে ভাবতে শেখায়।
শেষে বলতে হয় বইটির প্রচ্ছদের কথা, লাল এবং একটি অজানা হলুদ রংয়ের বেসের উপর নারী পুরুষের কিছু বিমূর্ত অবযয়ব যা যেন অভিজিৎ সেনের বাস্তবের ক্যানভাসে আঁকা চরিত্রগুলিই, যাদের পাঠোদ্ধার কিছুক্ষণ পরেই ঘটতে চলেছে।

একটা কথা নিশ্চিত, অভিজিৎ সেন পড়লে আমাদের জীবন-সম্পর্ক-আমাদের যাপনের এত বিচিত্রতাকে নিজের অনুভবে ধরার সংবেদন বাড়তে থাকবে। এই সংবেদনটুকু যে বড্ড দরকারি!
সুপ্রকাশকে অনেক ধন্যবাদ বাংলা সাহিত্যের জন্য খুব জরুরি কাজটি করেছেন বলে। নইলে যেদিন আমাদের সন্ততিরা কেঁদে ফিরে আসতে চাইবে ঘরে, দেখবে ঘরটাই নেই, ফুটন্ত ভাতের গন্ধ নেই কোথাও, মাটির গন্ধটুকু নেই কোথাও, এতটুকু খুদকুড়ো কোথাও নেই পড়ে।

অভিজিৎ সেনের পঞ্চাশটি গল্প। সুপ্রকাশ। মুদ্রিত মূল্যঃ 600 টাকা। কলকাতা

Related posts

Leave a Comment