Review

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা

নীহারীকা সান্যালের লেখায়
নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা-র পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ

নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা
শতঞ্জীব রাহা

বইটি পড়ে একটি বাক্যে যদি প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, তবে এটাই বলতে হবেঃ
অসামান্য মেধাবি ইঙ্গিতপূর্ণ গদ্যে, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ, সমাজতত্ত্ব ও সমাজবীক্ষার নিবিড় অনুশীলনের স্পর্শে এমন কোনো নাট্যচর্চার ইতিহাস অন্তত বাংলা ভাষায় লেখা হয়নি।

বইটির নামকরন একটি তথ্যনির্ভর গ্রন্থনা কে সূচিত করে তবে এটাও কৌতূহল জাগায় যে নদীয়া জেলাতে আবার কিসের নাট্যচর্চা! সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতা শহরের বাইরে আবার থিয়েটার চর্চা ! তার আবার ইতিহাস! এর অস্তিত্ব কী সম্ভব?ঠিক এখানেই তথাকথিত এলিট পাঠক কে নিঃশব্দে কষাঘাত করে এই বইটি। সমগ্র পৃষ্ঠা পড়ার পর মুগ্ধ না হয়ে স্থবির হয়ে যেতে হয় নিজের কূপমন্ডুকতায়। আদ্যোপান্ত একটি নিরীক্ষামূলক গবেষণা তো বটেই তার থেকেও বড় কথা এই যে শুধুমাত্র ভাষ‍্যশিল্পের মুন্সিয়ানায় এবং শব্দের অন্তর্বয়নে বইটির কাছে বারংবার শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যেতে হয়। সমগ্র বইটি মূলত চারটি অংশে বিভক্ত আদি ও মধ্য পর্ব, গণনাট্য পর্ব, সাম্প্রতিক পর্ব এবং উপসন্ঋতি(বানানটি ঠিকমতো লেখা গেল না)।

নদীয়া জেলার নিজস্ব আঙ্গিনা যে শিল্প-সংস্কৃতির সূতিকা গৃহ, পল্লী সংস্কৃতির পালা গান থেকে যাত্রা এবং তা থেকে ধীরে ধীরে এই দৃশ্য এবং শ্রব্য মাধ্যমটির থিয়েটারে উত্তরণ যে কি নিদারুণভাবে ঘটেছে, লেখক এর যাদুকলম মনোরম বিস্তারে করে প্রত্যক্ষ করায় সে অদেখা অজানা ইতিহাসকে। শ্রীকৃষ্ণের পালা গান তথা বৈষ্ণব সংস্কৃতি ঠিক কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল নদীয়া এবং পার্শ্ববর্তী জেলা এমনকি কলকাতার শিল্প মাধ্যমকে এবং এখনো নিঃশব্দে অলক্ষ্যে করে চলেছে, সেই সত্যই যথাযথ প্রমাণ এর সাথে আমরা প্রত্যক্ষ করি। দ্বিতীয় ভাগে, গণনাট্য পর্বে নাট্য আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকেই শুধুমাত্র সুচারুভঙ্গিতে বর্ণনা নয় বরং তৎকালীন রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ভৌগলিক পটভূমিকার গহন তল্লাটে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করেছেন লেখক একজন দক্ষ ডুবুরির মতো। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা গণনাট্যকে ঠিক কিভাবে প্রভাবিত করে দিকসঞ্চালিত করেছে, এই পর্বে তা অনুধ‍্যেয়। ঠিক এখানেই বইটি হয়ে উঠেছে একটি বিপন্ন সময়ের দলিল।

উপসন্হৃতি বিভাগের পরিকল্পনাক্রম, বিশ্লেষণ পাঠকের আনুগত্য ছিনিয়ে নেয় কিন্তু আনন্দের কথা এই যে তা একই সঙ্গে পাঠককে প্রশ্ন করতে এবং ভাবতেও শেখায়। সংস্কৃতির বেনোজলে নদীয়া তথা তাঁর ভৌগলিক বাতাবরণ পেরিয়ে কলকাতা শহরের বৌদ্ধিকতা সম্পন্ন নাট্য শিল্পের অনাগত ভবিষ্যৎ কি তা আমরা ভেবে আশঙ্কিত হই যখন লেখক বলেন ” একে কি বলা যায়: নির্মাণ পুনর্নির্মাণ না বিনির্মাণ? এ যাত্রা সঠিক বা নির্ধারিত পথে যাত্রা নাকি একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে একেবারেই বিপরীত যাত্রা?”
পরিশেষে বলতে পারি এই বইটি শুধুমাত্র নাট‍্যপ্রেমীদের জন্য নয়, যারা ইতিহাস খুঁজতে ভালোবাসেন এবং তার নিক্তিতে মাপতে চান বর্তমানকে, এই বই সেই গভীর অনুশীলনকারী পাঠকের জন্য। বইটির প্রচ্ছদে একটি ফাঁকা মঞ্চ যার আলোকসম্পাত মাপছে সময়ের নাব্যতা আর গভীরতা, এককথায় যা অনবদ‍্য । অসংখ্য পেপার কাটিং এবং নথিসমৃদ্ধ বইটির প্রকাশনার জন্য সুপ্রকাশ কে ধন্যবাদ।বইটির মূল্য নির্ধারণ ভাবীকালের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। তবে এটুকু প্রত্যাশা করা যায় যে কিছু বই আজ,কাল,সারাজীবনের। “নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা” সেরকমই একটি সাম্প্রতিক গ্রন্থনা।

Related posts

Leave a Comment