বড়ু চণ্ডীদাস বাংলা সাহিত্যের আদিকবি বাল্মীকি। তাঁর ধীকৃষ্ণকীর্তন খাঁটি বাংলা ভাবার বাঙালী-রচিত প্রথম কাব্য। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন বলে গৃহীত হলেও এটি প্রথমত, বিভিন্ন কবির পদরচনার সংকলন মাত্র সংস্কৃতে যাকে কোষগ্রন্থ বলে-এ তাই।
দ্বিতীয়ত, এটির ভাষা সর্বাংশে বাংলা নয়। শৌরসেনী অপভ্রংশের চিহ্ন এতে ছড়িয়ে রয়েছে এবং মৈথিলী, ওড়িয়া প্রভৃতি শব্দের বহুল ব্যবহার এতে লক্ষ্য করা গেছে, যে কারণে মৈথিলী, অসমীয়া এবং ওড়িয়ারাও পর্যন্ত এটিকে তাঁদের সাহিত্যের ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করতে চান। তৃতীয়ত, এতে যেসব কবির পরিচয় পাওয়া যায়, তাঁরা সবাই বাঙালী নন। সুতরাং সেদিক থেকে সুপরিস্ফুট বাংলা ভাষার, দেহে-মনে খাঁটি বাঙালীর রচিত প্রাচীনতর কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। মধ্যযুগের বাংলা ভাষার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন এতেই মেলে।
১৩১৬ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্পত বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়ালঘর থেকে এটির (পুঁথির) আবিষ্কার করেন। রায় মহাশয়ের সম্পাদনায় ১৩২৩ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। প্রাপ্ত পুঁথিটি তুলোট কাগজে লেখা, দু-তিন রকমের হস্তাক্ষর এতে আছে। পুঁথিটি আদিতে, মধ্যে কিছু কিছু স্থানে এবং শেষের দিকে খণ্ডিত। সাধারণত, বাংলা পুঁথির শেষ পৃষ্ঠায় গ্রন্থনান, গ্রন্থকারের নাম এবং গ্রন্থরচনার ও পুঁথিনকলের কালের নির্দেশ থাকে। একে পুষ্পিকা বলে। এই পুষ্পিকা না থাকায় গ্রন্থনাম, গ্রন্থকর্তার নির্ভরযোগ্য পরিচয় এবং গ্রন্থরচনার কালের কোনো সন্ধান মেলেনি। এতে কৃষ্ণলীলা বর্ণিত দেখে সম্পাদক মহাশয় নামকরণ করেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা সাহিত্যের প্রথম রাধা-কৃষ্ণলীলাবিষয়ক কাব্য। এর বিষয়বস্তু প্রকৃতই অভিনব। ভূভার হরণের জন্য গোলোকের বিষ্ণুর মর্ত্যে কৃষ্ণরূপে এবং লক্ষ্মীর রাবারূপে জন্মগ্রহণ এবং তাদের মিলন-লীলার কথাই এই কাব্যের প্রধান কাহিনী। এর বিষয়-জন্মখণ্ড, তাম্বুলখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছত্রখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, কালিয়দমনখণ্ড, যমুনাখণ্ড, হারখণ্ড, বাণখণ্ড, বংশীখণ্ড ও রাধাবিরহ এই তেরোটি অংশে বিভক্ত।
শেষ অংশ অর্থাৎ 'রাধাবিরহ' অংশে 'খণ্ড'-নাম যুক্ত নেই বলে কেউ কেউ অনুমান করেন, এই শেষ অংশটি বড়ু চণ্ডীদাসের রচনা নয়। কিন্তু এ অনুমান অযথার্থ, ধারণা। 'রাবাবিরহ' অংশে বর্ণিত বিষয়ের সূত্র পূর্বোল্লিখিত বংশীখণ্ডে মেলে।
Customers' review
Reviews
Be the first to review ""