প্রকাশের কোনো একটি প্রবহমান ধারাকে আমরা কী ভাবে দেখব? ধারাটি নিজের আকার পাবার আগে তার কিছু আভাস তৈরি হতে থাকে, সে আভাস জমাট বাঁধতে থাকে, তারপর একটা সময়ে এসে ধরে নেওয়া হয় এই হল তার আকারের মোটামুটি খাঁচাটি। যে কোনো সাহিত্য বা শিল্পের ধারা এইভাবেই চাক বেঁধে ওঠে। কিন্তু সেই খাঁচাও তো এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সে বদলাতে থাকে, মূল ধাঁচাটি ক্রমশ সুদূর হয়ে যায়, তখন হয়ত আবার নতুন করে তাকে নিয়ে কথা বলবার দরকার হয়ে পড়ে। আলোচনা একটা সময়ে শেষ করতেই হয়, কিন্তু যে বিষয় নিয়ে আলোচনা তা তো শেষ হয় না, তাই আলোচনার শেষে তার বাড়বৃদ্ধির আরো নানা সম্ভাবনা থেকে যায় যিনি আলোচনা করেন, তিনি তাঁর প্রজ্ঞা নিয়ে সেই সব সম্ভাবনার খানিকটা ইশারা আমাদের দিয়ে দিতে পারেন। কথাগুলো মনে এল গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের লেখা তিনশো বছরের যাত্রাশিল্পের ইতিহাস বইটি পড়তে পড়তে। গৌরাঙ্গপ্রসাদ যাত্রাশিল্পের ইতিহাসকে তিনশো বছর আগে থেকে ধরেছেন, কিন্তু তার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে সব সাহিত্য বা শিল্পকাজের মধ্যে, তাদের নিয়ে আলোচনা করতেও ভোলেন নি। তাঁর এই লেখা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দের একেবারে শেষ দিনে, ৩১ ডিসেম্বর তারিখে, অর্থাৎ আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগে। যাত্রার মত একটি অবিরত চলিষ্ণু শিল্পমাধ্যম, যার সঙ্গে বহু মানুষের সংযোগ-সমাজ জীবনের পরিবর্তন, রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির পরিবর্তন তাকে অবিরত নানা বাঁকের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এ বইয়ে তার মোটের ওপর বিস্তারিত আভাস দেওয়া আছে, পুরো বিবরণ আর কি করেই বা সম্ভব। এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা করব না যে যাঁরা যাত্রা শিল্প বিষয়ে উৎসাহী, গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের এই বইটি তাঁদের কাছে আকরগ্রন্থের সম্মান পাবার যোগ্য। এ বইয়ের প্রথমেই গৌরাঙ্গপ্রসাদ তাঁর নিজের জীবনের কিছু কথা জানিয়েছেন আমাদের। খুব গরিব ঘরের ছেলে, প্রকাশনা জগতের সঙ্গে যুক্ত হন, সে যুগের খুব বিখ্যাত উল্টোরথ পত্রিকার কর্মী হিসেবে আগ্রহ জন্মায় নাট্য এবং যাত্রাশিল্পের প্রতি। সে আগ্রহ কেবলমাত্র অ্যাকাডেমিক চর্চার মধ্যেই আটকে থাকে নি। গৌরাঙ্গপ্রসাদ নাটক লিখেছেন, সে সব নাটক প্রযোজিত হয়েছে, যাত্রাদলগুলির অন্দরমহলের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন, তাদের একজন হয়ে গেছেন। ফলে তাঁর এই তিনশো বছরের যাত্রাশিল্পের ইতিহাস কেবলমাত্র নিরাসক্ত অ্যাকাডেমিক বিবরণমাত্র নয়, এর মধ্যে মিশে গেছে যাত্রা জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা টুকরো ঘটনা, স্মৃতিকথা, যা লেখকের আবেগে মেশামেশি হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।
Customers' review
Reviews
Be the first to review ""