আমরা যারা আনপড় পাবলিক, যারা একটু আধটু গুরুচণ্ডা৯ করি, নেটে যত্রতত্র উড়ে বেড়াই এবং পল্লবগ্রাহী বলে আখছার গাল খাই। মহীনের ঘোড়াগুলি' সম্পর্কে তারা শুধু এইটুকু জানি, যে, সত্তরের দশকের কোনো এক সময় ছাদভতি সদ্যোজাত আন্টেনার তারকাঁটায় কান্ত্রিক খেয়ে উৎপটাং লাট্রর মতো দুনিয়ার ছাদনাতলায় টপকেছিল এই অজানা উড়ন্ত বস্তুরা। ললিতলবঙ্গলতা-কাটিং কিনচ্যাক হিন্দি গানে যখন জগৎ কোমর দোলাচ্ছে, তখন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল নিভন্ত নকশালবাড়ি, কোমরের খাপে আধখানা সলিল চৌধুরি, তেরো আউন্স বাউল এবং দু'ছিপি জ্যাজ ও কীর্তনের গলাজ্বালানো মিক্সচার। তাদের সৃষ্টিরহস্য ছিল যৌথতার ধূসরত্বে ঢাকা, জীবনের বাঁদিকের বুকপকেটে জীবনানন্দ দাশ, ঈষৎ অধিকই ছিল বিষন্নতা। গানবাজনা হয়েছিল বিস্তর, আরও বেশি উড়েছিল ক্ষ্যাপামির ধুলো, কারণ ঘোড়াদের বগলের নিচে দু-পিস ইচ্ছেডানা থাকলেও, খুরে কোনো নাল ছিলনা।
আমরা, যারা ইন্টারনেটে চরে খাই, যারা ফুস করে পেরিয়ে এসেছি সত্তরের মৃত্যু উপত্যকা, দু-একটি পেরেস্ত্রোইকা ও সোভিয়েত পতনের শব্দ, যুগপৎ বার্লিনের পাঁচিল ও ওয়াই-টুকে টপকে দেখে নিয়েছি রূপকথাদের টুকটাক কেটে পড়া, তারা এও বিলক্ষণই জানি, যে, এসবই কুয়াশা তুলিতে আঁকা শহরতলির প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ মাত্র। আদতে 'মহীনের ঘোড়াগুলি' কী ও কেন, সে রহস্য এখনও বিশবাঁও জলতলে। একথা কখনও স্পষ্ট করে জানা যায়নি, যে, ওই আশ্চর্য যানের ঘোড়ারা কারা এ ভিনগ্রহী ঘোড়ারা কি মূলতঃ অন্তর্ঘাতী, ব্যর্থ বিপ্লব প্রচেষ্টার পর যারা গা ঢাকা দেয় গোপন কন্দরে? নাকি উদ্ধত হয়গণ বাঁচেই এক বিকল্প জীবনাচরণে, স্রেফ ভালবেসে স্বেচ্ছা প্রব্রজ্যায় চলে যায় এই সুরে, বহুদূরে। এই অশ্বখুরের দাপাদাপি কি এক রাজনৈতিক প্রকল্প, এ হ্রেষাধ্বনি কি এক সাঙ্গীতিক উপপ্লবের সংকেতচিহ্ন? নাকি এসব স্রেফ মায়ার কবিতা আর বিষ্যাতায় সব-হারানোর গান, যাদের 'ভালোবাসি' উচ্চারণের আগে অব্যর্থভাবে জুড়ে থাকে 'হায়'। এ ভালবাসার প্রকরণ কি প্রিলুডের সিম্ফনিক শৃঙ্খলায় বাঁধা, নাকি 'ভালো লাগেনা'র হাহাকার, ইমপ্রোভাইজেশন আর স্বতঃস্ফূর্ততায়?
মহীনের গানই বা কোনগুলো, সে রহস্যও ঘনঘোর। আমরা যারা গুরু ও চণ্ডাল, বচ্ছরভর লেখালিখি নামক আগাছা ও ফলমূলের চাষাবাদ করি, বইমেলায় ইতিউতি উঁকি মারি, যারা ফালতু ঝগড়ায় জড়াই আর অকারণে ঝাড়ি বাকতাল্লা, তারা সেসবও জানি। খেউড় আর কৌদল, পুকুরপাড়ের কলহে চিল্লাতে চিল্লাতে, কেউ বিশ্বাস না করলেও, মাইরি, আমাদেরও ঘেন্না হয়, কষ্ট হয়। বাথরুমে ঢুকে গান গাইতে গাইতে উগরে দিই, ক্রোধ, বিরক্তি, বিষষ্ণাতা। চানঘরের সেই ঘেন্না নব্বইয়ের হলেও মহীনেরই কিনা এ রহস্যের অবশ্য কোনো সমাধান নেই। আমরা অবশ্য মহীন ভেবেই গাই, কিন্তু আমাদের উগরে দেওয়া অস্তিত্বের কোন গান মহীনের, কোন গান মহীনের নয়, সে আরেক প্রশ্নচিহ্ন। বীজমস্ত্রের মতো যা রচিত হয়েছিল সত্তরের সেই আদিম আস্তাবলে, গূঢ় সাধনার কমিউনে বাঁধা সেই গানগুলিই কি 'আসল' মহীন, মালিকানাহীনতাই যার স্বাক্ষর? নাকি আনপড় পাবলিক যে গানগুলিকে 'মহীন' বলে চেনে, নব্বইয়ের দমকা হাওয়ায় মহীনের ঘোড়াগুলি' সম্পাদিত হয়ে যারা ঢুকে এল ঘরে, তারাও মহীনই? এর শিল্পীরা, আদি ঘোড়া না হলেও, অন্তত টাটু পদবাচ্য কি, মহীনের ইচ্ছেডানার উত্তরাধিকার নিয়ে যারা কেউ কেউ পেগাসাস হয়ে উড়ে যাবে ভবিষ্যতে?
আমরা এও জানি এসবের উত্তর হয়না। ও ভাবে ছক কেটে সৃষ্টিরহস্যের সমাধান করা যায়না।
Customers' review
Reviews
Be the first to review ""